বাংলাদেশের কৃষিবিদ সমাজের প্রাচীন ও মর্যাদাপূর্ণ সংগঠন কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন অব বাংলাদেশ (কেআইবি) বর্তমানে এক গভীর প্রশাসনিক সংকটের মুখে। সংগঠনের অভ্যন্তরে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অসন্তোষ, আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ এবং নির্বাচন না হওয়ার কারণে এখন প্রতিষ্ঠানটি কার্যত দ্বন্দ্ব ও অবিশ্বাসের ঘূর্ণাবর্তে পড়ে গেছে।
প্রশাসক নিয়োগের প্রেক্ষাপট
সমাজসেবা অধিদপ্তর চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি আবদুর রব খানকে কেআইবির প্রশাসক হিসেবে ৯০ দিনের জন্য নিয়োগ দেয়। মূল দায়িত্ব ছিল—গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নতুন নির্বাচন আয়োজন করে নির্বাচিত কমিটির কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করা।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই উদ্দেশ্য পূরণ না হয়ে, বরং প্রশাসকের কর্মকাণ্ড ঘিরে তৈরি হয় বিতর্ক ও বিভাজন।
অনিয়মের অভিযোগ
‘এগ্রিকালচারিস্ট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এ্যাব)’-এর আহ্বায়ক ড. কামরুজ্জামান কায়সার অভিযোগ করেছেন, প্রশাসক নির্বাচনের প্রস্তুতি না নিয়ে বরং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প ও নিয়োগ বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েন।
তার দাবি, প্রশাসকের মেয়াদ দুই দফা বাড়ানো হলেও তিনি ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত নির্বাচন আয়োজনের কোনো উদ্যোগ নেননি। বরং কেআইবির তহবিল থেকে কোটি টাকার ব্যয়ে নানা ‘উন্নয়ন কাজ’ ও ‘নিয়োগ কার্যক্রমে’ আর্থিক অনিয়ম সংঘটিত হয়।
এ্যাবের সদস্য সচিব শাহাদত হোসেন বিপ্লব বলেন, প্রশাসকের কোনো এখতিয়ার ছিল না নতুন নিয়োগ বা উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনের, তবুও তিনি ব্যক্তিপরিচিত লোকদের নিয়োগ দেন এবং কোটেশন ছাড়া ব্যয় বাড়িয়ে অর্থ আত্মসাৎ করেন বলে অভিযোগ ওঠে।
উদাহরণ হিসেবে তিনি তুলে ধরেন—
-
এসি মেরামতে ৯৩ হাজার টাকার বিল দেখানো হয়েছে ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা
-
ছাদ মেরামতে ১০ লাখ টাকার কাজ দেখানো হয়েছে ১৫ লাখ টাকা
-
সিসি ক্যামেরা স্থাপনে ২ লাখ টাকার কাজ দেখানো হয়েছে ৫ লাখ টাকা
এছাড়া প্রশাসক মাসে ১.৭৫ লাখ টাকা বেতন, ১ লাখ টাকার তেল খরচ, ঈদ বোনাস ও নববর্ষ ভাতা নিয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
তদন্ত ও প্রশাসনিক জটিলতা
এ্যাব নেতারা দাবি করেছেন, তারা সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সাইদুর রহমান খানের সঙ্গে দেখা করেছেন। তিনি নাকি তাদের আশ্বস্ত করেছেন যে, তিন দিনের মধ্যে একজন জ্যেষ্ঠ কৃষিবিদকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে এবং আবদুর রব খানের মেয়াদ আর বাড়ানো হবে না।
এই আশ্বাসের পরও কেআইবিতে উত্তেজনা কমেনি। কৃষিবিদ সমাজের একটি অংশ বলছে, প্রশাসক নির্দেশনা অমান্য করে এখনও অফিসে কার্যক্রম পরিচালনা করছেন, অন্যদিকে তার সমর্থকেরা এটিকে ‘সংগঠন অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র’ বলে উল্লেখ করছেন।
মিথ্যা মামলার অভিযোগ ও রাজনৈতিক ইন্ধন
এ্যাব নেতারা অভিযোগ করেন, কৃষিবিদরা যখন প্রশাসকের অপসারণ দাবি করছেন, তখন তাদের বিরুদ্ধেই ‘ভাঙচুর ও অরাজকতার মিথ্যা মামলা’ করা হয়েছে।
তাদের প্রশ্ন, “যে প্রতিষ্ঠান আমাদের নিজস্ব অর্থে গড়া, সেটি আমরা কেন ভাঙচুর করব?”
এ্যাব নেতারা আরও ইঙ্গিত দেন, কেআইবির এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির পেছনে একটি বিশেষ রাজনৈতিক গোষ্ঠীর ইন্ধন রয়েছে, যারা সংগঠনটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করছে বলে তাদের ধারণা।
প্রেক্ষাপট: কেআইবির গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য ও সংকট
কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন অব বাংলাদেশ (কেআইবি) কৃষিবিদদের একমাত্র জাতীয় পেশাজীবী সংগঠন। বহু দশক ধরে প্রতিষ্ঠানটি কৃষি গবেষণা, শিক্ষা, নীতি প্রণয়ন ও কৃষককল্যাণে ভূমিকা রেখে এসেছে।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর গণতান্ত্রিক নির্বাচন অনিয়মিত হয়ে পড়েছে, ফলে নেতৃত্ব নির্বাচনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সংকটের মূল ও করণীয়
বিশ্লেষকদের মতে, কেআইবির বর্তমান সংকটের মূল কারণ—
গঠনতান্ত্রিক প্রক্রিয়া উপেক্ষা করে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার চেষ্টা
-
অর্থনৈতিক স্বচ্ছতার ঘাটতি ও নিরীক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা
-
রাজনৈতিক প্রভাব ও দলীয় আনুগত্যের অনুপ্রবেশ
-
নির্বাচন বিলম্বের ফলে সদস্যদের আস্থাহীনতা
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজন:
-
স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন
-
দ্রুত সময়ের মধ্যে গণতান্ত্রিক নির্বাচন
-
অডিট রিপোর্ট প্রকাশ ও আর্থিক লেনদেনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা
-
এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত একটি পেশাগত পরিবেশ পুনঃস্থাপন।
কেআইবি শুধু একটি সংগঠন নয়; এটি বাংলাদেশের কৃষিবিদ সম্প্রদায়ের পেশাগত মর্যাদা ও ঐক্যের প্রতীক।
তাই এর নেতৃত্বে যে কোনো ধরনের অনিয়ম বা অস্থিরতা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি নয়, পুরো কৃষি খাতের পেশাদার কাঠামোকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে।
এখন সময় এসেছে, কৃষিবিদ সমাজের জ্যেষ্ঠ ও নিরপেক্ষ নেতৃত্ব এগিয়ে এসে কেআইবিকে তার স্বচ্ছ, গণতান্ত্রিক ও পেশাদার মূলচিন্তায় ফিরিয়ে আনার।
Vote for Tagged Users
★ ★ ★
★ ★ ★
★ ★ ★
★ ★ ★

